না.গঞ্জে যেমন ছিল ৯০ দশকে মধ্যবিত্তের রোজা
রমজান মাস এলেই বদলে যেত নব্বই দশকের মধ্যবিত্ত পরিবারের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা। তখনকার সময়ের সীমিত আয়, সাদামাটা বাজার আর পারিবারিক বন্ধনের উষ্ণতায় রোজার মাস ছিল এক অন্যরকম অনুভূতির নাম। প্রযুক্তি আর বিলাসিতার ছোঁয়া না থাকলেও আন্তরিকতা আর ধর্মীয় আবহে ভরা ছিল প্রতিটি দিন।
নব্বই দশকে মধ্যবিত্ত পরিবারের রোজার প্রস্তুতি শুরু হতো শাবান মাসের শেষ দিক থেকেই। চাল, ডাল, ছোলা, মুড়ি, চিড়া, খেজুর—এসব শুকনো খাবার আগেভাগেই মজুত করা হতো। অনেক পরিবারে রোজার জন্য আলাদা একটি বাজার তালিকা তৈরি করা ছিল নিয়মের মতো। তখন বাজারদর তুলনামূলক কম হলেও আয় সীমিত থাকায় হিসেব করে চলাই ছিল মধ্যবিত্ত জীবনের বাস্তবতা।
ইফতারের আয়োজনে থাকত দেশীয় খাবারের প্রাধান্য। বুটের ডাল, পেঁয়াজু, বেগুনি, আলুর চপ, ছোলা ভুনা, মুড়ি-মাখা—এসবই ছিল ঘরোয়া হাতে তৈরি। শরবত বলতে লেবুর শরবত বা রুহ আফজা মিশ্রিত পানিই ছিল বিলাসিতা। অনেক পরিবারে সপ্তাহে একদিন সামান্য জিলাপি বা বেগুনি কিনে আনা হতো, সেটাই ছিল শিশুদের জন্য বড় আনন্দ।
সেহরিতে থাকত ভাত, ডাল, ভর্তা বা ডিমভাজি—সহজপাচ্য ঘরোয়া খাবার। বিদ্যুৎ বিভ্রাট ছিল নিত্যসঙ্গী, তাই গরমে কষ্ট করেই সেহরি খেয়ে রোজা রাখা ছিল স্বাভাবিক ব্যাপার। গ্রামাঞ্চলে অনেক জায়গায় মসজিদের মাইকে সেহরির শেষ সময়ের ঘোষণা ছিল মানুষের নির্ভরতার জায়গা।
রোজার সময় পারিবারিক বন্ধনও ছিল দৃঢ়। ইফতারের সময় সবাই একসঙ্গে বসে খাওয়া ছিল অলিখিত নিয়ম। প্রতিবেশীর বাড়িতে ইফতার পাঠানো বা ভাগাভাগি করে খাওয়ার সংস্কৃতিও ছিল প্রবল। নতুন জামা বা ঈদের কেনাকাটা হতো সাধ্যের মধ্যে, তবু আনন্দে ঘাটতি থাকত না।
সময়ের সঙ্গে বদলেছে জীবনযাত্রা, বাজার, খাবারের ধরন ও প্রযুক্তি। এখন মধ্যবিত্তের রোজায় এসেছে নানা রকম প্যাকেটজাত খাবার, রেস্টুরেন্টের ইফতার, অনলাইন বাজার। তবু অনেকেই স্মৃতিচারণ করে বলেন—সেই নব্বই দশকের সাদামাটা রোজাতেই ছিল বেশি তৃপ্তি, বেশি আন্তরিকতা আর পারিবারিক উষ্ণতা।
সমাজ বিশ্লেষকদের মতে, নব্বই দশকের মধ্যবিত্তের রোজা ছিল আত্মসংযম, সীমিত সামর্থ্য আর পারিবারিক ঐক্যের এক অনন্য উদাহরণ; যা আজকের ভোগবাদী সময়ে স্মৃতির আবেগ হয়ে আছে অনেকের মনে।

