শিল্পের কঠিন সময়ে সামনে থাকা এক ব্যবসায়ী নেতার গল্প
বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের গল্প শুধু রপ্তানি, বৈদেশিক মুদ্রা আর লাখ লাখ কর্মসংস্থানের গল্প নয়। এই শিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের অর্থনীতির স্থিতিশীলতা, শ্রমজীবী মানুষের জীবন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের ভাবমূর্তি।
আর এই বিশাল শিল্পখাত যখন একের পর এক সংকটের মুখে পড়ে, তখন সামনে থেকে কথা বলতে হয় কাউকে। কখনো শ্রমিক অসন্তোষ, কখনো গ্যাস সংকট, কখনো ব্যাংকিং জটিলতা, কখনো বাড়তে থাকা উৎপাদন ব্যয়, আবার কখনো আন্তর্জাতিক বাজারের চাপ।
বাংলাদেশের নিট পোশাকশিল্পের অন্যতম শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন, BKMEA এর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই কণ্ঠগুলোর অন্যতম হয়ে উঠেছেন।
তার নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় পরীক্ষাগুলো এসেছে যখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক ছিল না। বরং শিল্পের সামনে ছিল অনিশ্চয়তা।
নেতৃত্বের পথ দীর্ঘদিনের
মোহাম্মদ হাতেমের BKMEA নেতৃত্বের ইতিহাস সাম্প্রতিক কয়েক বছরের নয়। সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, তিনি ১৯৯৯ সাল থেকেই বিভিন্ন পর্যায়ে BKMEA এর পরিচালনা ও নেতৃত্বের সঙ্গে যুক্ত। পরিচালক থেকে শুরু করে সহসভাপতি, প্রথম সহসভাপতি, নির্বাহী সভাপতি এবং সভাপতি হিসেবে তিনি দীর্ঘ সময় ধরে সংগঠনটির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কাজ করেছেন। ২০২১ থেকে ২০২৩ মেয়াদে তিনি নির্বাহী সভাপতি এবং ২০২৩ থেকে ২০২৫ মেয়াদে সভাপতি ছিলেন। ২০২৫ থেকে ২০২৭ মেয়াদেও তিনি সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
অর্থাৎ, পোশাকশিল্পের ভেতরের উত্থান, পরিবর্তন ও সংকটকে তিনি বাইরে থেকে দেখেননি। দীর্ঘ সময় ধরে এই শিল্পের নীতি, ব্যবসা, শ্রম ও রপ্তানি বাস্তবতার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থেকেছেন।
ব্যবসায়ী হিসেবে তিনি MB Knit Fashion Ltd এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক। ১৯৯২ সালে প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে তার উদ্যোক্তা জীবনের সূচনা এবং পরবর্তী সময়ে শিল্প সংগঠনে তার সক্রিয় ভূমিকা তাকে ব্যবসায়ী মহলের পাশাপাশি নীতিনির্ধারণী পর্যায়েও পরিচিত করেছে।
সংকটের সময়ই নেতৃত্বের পরীক্ষা
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের পোশাকশিল্পে তৈরি হয় নতুন ধরনের অনিশ্চয়তা। বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে শ্রম অসন্তোষ, কারখানা বন্ধ, বেতন পরিশোধ নিয়ে উদ্বেগ এবং উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়।
সেই সময়ে মালিক, শ্রমিক ও সরকারের মধ্যে সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তা সামনে চলে আসে। BKMEA এর পক্ষ থেকে শিল্পাঞ্চলে শ্রমশৃঙ্খলা বজায় রাখতে সরকার, মালিক ও শ্রমিক প্রতিনিধিদের নিয়ে আলোচনা করা হয়। একই সময়ে আশুলিয়ার চলমান সংকট নিয়েও সংগঠনের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেওয়া হয়।
মোহাম্মদ হাতেমের নেতৃত্বের একটি বৈশিষ্ট্য এখানে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি শুধু সমস্যার কথা বলেছেন তা নয়, সমস্যার সমাধানে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে আলোচনার টেবিলে আনার ওপর জোর দিয়েছেন।
BKMEA এর নিজস্ব প্রোফাইলেও উল্লেখ করা হয়েছে, রাজনৈতিক অস্থিরতার পর শ্রমিক, মালিক ও সরকারের মধ্যে সংলাপ এবং শিল্পে স্থিতিশীলতা তৈরিতে তার ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
গ্যাস সংকট: শিল্পের অস্তিত্বের প্রশ্নে সরব হাতেম
সাম্প্রতিক সময়ে পোশাকশিল্পের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হয়ে উঠেছে গ্যাস সংকট।
২০২৫ সাল থেকেই গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছে। নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, কোনাবাড়ী, শ্রীপুরসহ বিভিন্ন শিল্প এলাকায় গ্যাস সংকটের কারণে কারখানাগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছিল না।
২০২৬ সালের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট নিয়ে সরব BKMEA সভাপতি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, লোডশেডিং কোথাও কোথাও দিনে কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছিল এবং জ্বালানি সংকটের কারণে পোশাক কারখানার উৎপাদন ব্যয় প্রায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যাচ্ছিল।
আর আগস্ট ২০২৬ এ এসে সংকট আরও তীব্র রূপ নেয়।
২২ আগস্ট BKMEA আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে মোহাম্মদ হাতেম জানান, গ্যাসের চাপ শূন্যের কাছাকাছি নেমে যাওয়ায় প্রায় ৩০০ কারখানা কার্যত বসে আছে। তার আশঙ্কা, এই পরিস্থিতির কারণে মাসিক রপ্তানি আয়ের প্রায় ৪০ শতাংশ ঝুঁকিতে পড়তে পারে এবং সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে না পারলে বিদেশি ক্রেতারা প্রতিবেশী দেশগুলোর দিকে চলে যেতে পারেন।
এখানেই তার নেতৃত্বের আরেকটি দিক সামনে আসে। তিনি সংকটকে শুধু ব্যবসায়ীদের সমস্যা হিসেবে দেখছেন না। তার বক্তব্যে বারবার উঠে আসছে ক্রেতা হারানোর ঝুঁকি, রপ্তানি কমে যাওয়ার আশঙ্কা এবং বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাজার ধরে রাখার প্রশ্ন।
ব্যাংকিং সংকটেও একই অবস্থান
পোশাকশিল্পের সংকট শুধু গ্যাসে আটকে নেই। উচ্চ সুদ, ঋণপ্রাপ্তির জটিলতা, ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকট এবং ক্রমবর্ধমান উৎপাদন ব্যয় শিল্পের উদ্যোক্তাদের ওপর চাপ তৈরি করেছে।
২০২৫ সালের ডিসেম্বরে The Daily Star কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মোহাম্মদ হাতেম পরিস্থিতিকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, উচ্চ ঋণব্যয়, কারখানা বন্ধ এবং আর্থিক সংকটের কারণে শিল্পটি কঠিন সময় পার করছে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, অনেক ব্যবসার জন্য ঋণের সুদের হার প্রায় ১৫ থেকে ১৬ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছিল।
তার অভিযোগ ছিল, একদিকে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে অনেক আন্তর্জাতিক ক্রেতা কম দামে পণ্য নিতে চাইছে। একই সঙ্গে অর্ডার বাতিল বা অর্থ পরিশোধে বিলম্বের মতো ঘটনাও ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
শুধু অভিযোগ নয়, নীতির জায়গাতেও সক্রিয়
মোহাম্মদ হাতেমের নেতৃত্বের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সক্রিয় থাকা।
LDC উত্তরণ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, ব্যাংকিং নীতি, কাস্টমস, রপ্তানি সুবিধা, জ্বালানি এবং ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্প নিয়ে তিনি নিয়মিত সরকারের সঙ্গে আলোচনা করছেন।
২০২৬ সালের মার্চে Policy Research Institute আয়োজিত এক আলোচনায় তিনি LDC উত্তরণের চ্যালেঞ্জ, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি, ব্যাংকিং নীতি এবং রপ্তানি খাতের ওপর আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের চাপের বিষয়গুলো তুলে ধরেন।
অন্যদিকে জুনে Intex Bangladesh 2026 এ তিনি বাংলাদেশের স্পিনিং মিলসহ ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পকে শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।
আগস্টে TEXCHEM Expo 2026 এ তার বক্তব্যে উঠে আসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, Man Made Fiber বা MMF খাতে বিনিয়োগ এবং প্রযুক্তি স্থানান্তর। চীনসহ বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর তিনি গুরুত্ব দেন।
অর্থাৎ তার নেতৃত্বের আলোচনায় শুধু আজকের সংকট নয়, আগামী দিনের প্রতিযোগিতার প্রস্তুতিও জায়গা পাচ্ছে।
শ্রমিকের প্রশ্নেও অবস্থান
পোশাকশিল্পে মালিক ও শ্রমিকের সম্পর্ক সবসময়ই সংবেদনশীল। উৎপাদন বন্ধ হলে মালিক ক্ষতিগ্রস্ত হন, শ্রমিকের আয় বন্ধ হয়, আর অর্ডার সময়মতো সরবরাহ করতে না পারলে দেশের রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এই বাস্তবতায় শ্রমিক কল্যাণ ও শিল্পের স্থিতিশীলতার মধ্যে ভারসাম্য তৈরির প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ।
২০২৪ সালের অস্থিরতার সময় BKMEA সরকার, মালিক ও শ্রমিক প্রতিনিধিদের একসঙ্গে নিয়ে শ্রমশৃঙ্খলা বজায় রাখার উদ্যোগ নেয়। পাশাপাশি বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে আহতদের চিকিৎসায় BKMEA এর পক্ষ থেকে ৫০ লাখ টাকার সহায়তাও দেওয়া হয়।
মোহাম্মদ হাতেম নিজেও শ্রমিক অধিকার, নিরাপত্তা এবং শিল্পে সামাজিক কমপ্লায়েন্সের গুরুত্বের কথা বলেছেন। তিনি মনে করেন, আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান ধরে রাখতে শ্রমিক অধিকার ও নিরাপদ কর্মপরিবেশকে গুরুত্ব দিতে হবে।
পুরস্কারও এসেছে
দীর্ঘদিনের শিল্পসংশ্লিষ্ট ভূমিকার স্বীকৃতিও পেয়েছেন মোহাম্মদ হাতেম।
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে BGAPMEA Members’ Gala Night এবং Award Giving Ceremony তে তাকে Lifetime Achievement Award দেওয়া হয়। পোশাক ও গার্মেন্টস অ্যাক্সেসরিজ শিল্পে তার দীর্ঘদিনের অবদান এবং নেতৃত্বের স্বীকৃতি হিসেবেই এই সম্মান দেওয়া হয়।
সামনে আরও কঠিন সময়
বাংলাদেশের পোশাকশিল্প এখন এমন একটি সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে যেখানে শুধু সস্তা শ্রম আর বড় উৎপাদন সক্ষমতা দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকা কঠিন।
LDC উত্তরণ, উচ্চ উৎপাদন ব্যয়, জ্বালানি সংকট, ব্যাংকিং সমস্যা, কৃত্রিম তন্তুভিত্তিক পোশাকের বাজার, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের নতুন কমপ্লায়েন্স চাহিদা, সবকিছু মিলিয়ে শিল্পটি একটি বড় পরিবর্তনের মুখে।
জুলাই ২০২৬ এ BAYLA Future Summit এ মোহাম্মদ হাতেম AI, sustainability এবং তরুণ নেতৃত্বের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। অর্থাৎ তার বক্তব্যে ভবিষ্যৎ শিল্পের জন্য প্রযুক্তি, দক্ষতা ও নতুন নেতৃত্বের প্রস্তুতির বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।
একজন সভাপতির চেয়েও বড় দায়িত্ব
মোহাম্মদ হাতেমের নেতৃত্বকে মূল্যায়ন করতে গেলে শুধু তিনি কতবার সভাপতি হয়েছেন, সেটি দিয়ে বিচার করলে পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না।
তার দীর্ঘ পথচলার গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, তিনি এমন একটি শিল্প সংগঠনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন যার সদস্য সংখ্যা ২,৫৪০ এর বেশি এবং যার সঙ্গে প্রায় ১৯ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান জড়িত বলে BKMEA জানিয়েছে।
এই অবস্থানে দাঁড়িয়ে তার প্রতিটি বক্তব্যের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে উদ্যোক্তার স্বার্থ, শ্রমিকের জীবন, বৈদেশিক ক্রেতার আস্থা এবং দেশের রপ্তানি অর্থনীতি।
সমালোচনা বা মতভিন্নতা যাই থাকুক, একটি বিষয় অস্বীকার করার সুযোগ কম। বাংলাদেশের পোশাকশিল্প যখন সংকটের মুখে পড়ে, মোহাম্মদ হাতেম তখন নীরব থাকার মানুষ নন।
গ্যাস নেই, তিনি কথা বলেন।
বিদ্যুৎ সংকট, তিনি কথা বলেন।
ব্যাংক ঋণের সুদ বাড়ে, তিনি কথা বলেন।
শ্রমিক অসন্তোষ তৈরি হয়, তিনি আলোচনার কথা বলেন।
আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ে, তিনি নতুন প্রযুক্তি ও বিনিয়োগের কথা বলেন।
আর এ কারণেই তার নেতৃত্বের গল্পটি শুধু একজন ব্যবসায়ী নেতার গল্প নয়। এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি খাতের কঠিন সময়ে সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলার এক নেতৃত্বের গল্প।
সংকট হয়তো শেষ হয়নি। বরং সামনে আরও বড় চ্যালেঞ্জ। কিন্তু সেই চ্যালেঞ্জের মুখে শিল্পের পক্ষে যে কণ্ঠগুলো সবচেয়ে দৃশ্যমান, মোহাম্মদ হাতেম তাদের একজন।
একজন ব্যবসায়ী থেকে শিল্পনেতা, আর শিল্পনেতা থেকে সংকটের সময়ে খাতটির অন্যতম মুখ হয়ে ওঠার এই পথই তাকে আলাদা করে চেনায়।

