দীর্ঘদিনের অভ্যন্তরীণ বিভক্তি ও নেতৃত্বের বিরোধের পর নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগর হেফাজতে ইসলামের নতুন কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। নতুন ঘোষিত দুই কমিটিতে স্থান পাননি জেলা ও মহানগর জমিয়তের আলোচিত দুই নেতা মুফতি মনির হোসাইন কাসেমী ও মাওলানা ফেরদাউসুর রহমান। ফলে নারায়ণগঞ্জের হেফাজতের নেতৃত্বে পুরোনো বলয়ের পরিবর্তে নতুন নেতৃত্বের আবির্ভাব ঘটেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বুধবার (২৬ আগস্ট) বিকেলে ডিআইটি রেলওয়ে কলোনী জামে মসজিদে অনুষ্ঠিত সভা শেষে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মুফতি বশিরউল্লাহ নতুন জেলা ও মহানগর কমিটির আংশিক নেতৃত্ব ঘোষণা করেন।
জেলা কমিটির সভাপতি করা হয়েছে ডিআইটি রেলওয়ে কলোনী জামে মসজিদের খতিব মাওলানা আব্দুল আউয়ালকে। তিনি হেফাজতের কেন্দ্রীয় কমিটির নায়েবে আমীর এবং এর আগেও নারায়ণগঞ্জ জেলা কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। জেলা কমিটিতে জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি হয়েছেন আমলাপাড়া মাদরাসার মাওলানা আব্দুল কাদের এবং সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন মাদানীনগর মাদরাসার মুফতি বশিরউল্লাহ।
এছাড়া যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাওলানা বদিউল আলম, সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা মহিউদ্দিন খান (সোনারগাঁ), অর্থ সম্পাদক মাওলানা খোরশেদ আলম কাসেমী এবং প্রচার সম্পাদক মুফতি শেখ শিব্বিরের নাম ঘোষণা করা হয়েছে।
অন্যদিকে, মহানগর কমিটির সভাপতি হয়েছেন মুফতি জাকির হোসেন কাসেমী এবং সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন দেওভোগ মাদরাসার মাওলানা আব্দুর রহমান। যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক করা হয়েছে মুফতি মামুনুর রশীদকে এবং সাংগঠনিক সম্পাদক করা হয়েছে মাওলানা মাহমুদ ইবনে আউয়ালকে।
কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক বশিরউল্লাহ জানিয়েছেন, পরবর্তীতে আরও সদস্য যুক্ত করে জেলা ও মহানগরের কমিটি পূর্ণাঙ্গ করা হবে।
পুরোনো কমিটি ঘিরে বিভক্তি
এর আগে ২০২৪ সালের ৪ অক্টোবর প্রতিনিধি সম্মেলনের মাধ্যমে নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগর হেফাজতে ইসলামের কমিটি ঘোষণা করা হয়েছিল। শহরের চাষাঢ়ার বাগে জান্নাত জামে মসজিদে অনুষ্ঠিত ওই সম্মেলনে মুফতি মনির হোসাইন কাসেমীকে জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক এবং এবিএম সিরাজুল মামুনকে অপর গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব দেওয়া হয়। মহানগর কমিটিতে সভাপতি করা হয় মুফতি হারুনুর রশিদকে এবং সাধারণ সম্পাদক করা হয় মাওলানা মীর আহমাদুল্লাহকে।
তবে ওই কমিটি ঘোষণার সময় হেফাজতের একটি বড় অংশের নেতাকর্মী, যার মধ্যে মাওলানা আব্দুল আউয়ালও ছিলেন, অনুপস্থিত ছিলেন বলে জানা যায়। এরপর থেকেই নারায়ণগঞ্জ হেফাজতে নেতৃত্ব ও কমিটি নিয়ে বিভক্তি প্রকাশ্যে আসে।
‘ওসমান বলয়ের’ সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ
এদিকে নতুন কমিটিতে স্থান না পাওয়া মাওলানা ফেরদাউসুর রহমানকে ঘিরে নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গনে দীর্ঘদিন ধরেই নানা আলোচনা রয়েছে। তিনি নারায়ণগঞ্জের প্রভাবশালী ওসমান পরিবারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন বলে স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে।
ফেরদাউসুর রহমানকে সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের ছোট ভাই হিসেবে পরিচিত করে বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে প্রচার করা হয়েছে বলেও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়। এছাড়া ওসমান পরিবারের আরেক সদস্য ও সাবেক সংসদ সদস্য সেলিম ওসমানের নির্বাচনী প্রচারণায়ও তাকে দেখা গেছে বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে।
তবে এসব রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতার বিষয়ে ফেরদাউসুর রহমানের বক্তব্য এ প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।
নতুন কমিটিতে তার অনুপস্থিতিকে কেন্দ্র করে নারায়ণগঞ্জের হেফাজতের রাজনীতিতে পুরোনো ‘ওসমান বলয়’-এর প্রভাব কমে যাওয়ার আলোচনা শুরু হয়েছে। যদিও হেফাজতের নতুন নেতৃত্বের পক্ষ থেকে কমিটি গঠনের কারণ হিসেবে ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক বলয়ের পরিবর্তে সংগঠনের অভ্যন্তরীণ সাংগঠনিক বিষয়কেই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
নতুন কমিটি ঘোষণার মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের বিভক্তি কাটিয়ে নারায়ণগঞ্জ হেফাজতে ইসলাম সাংগঠনিকভাবে কতটা ঐক্যবদ্ধ হতে পারে, এখন সেটিই দেখার বিষয়।

