নারায়ণগঞ্জে নৌ পুলিশের এএসআই আ. মান্নানের অস্বাভাবিক আচরণের একটি ভিডিও সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। ভিডিওটি ঘিরে নানা আলোচনা ও সমালোচনার মধ্যে এবার ঘটনার ব্যাখ্যা দিয়েছেন ভাইরাল হওয়া সেই এএসআই মান্নান।
তার দাবি, স্বাভাবিক অবস্থায় তিনি ওই আচরণ করেননি। চায়ের সঙ্গে নেশাজাতীয় বা অজ্ঞাত কোনো পদার্থ মিশিয়ে তাকে অচেতন করার পর একটি চক্র তাকে মারধর করে দুই লাখ টাকা নিয়ে যায়। পরে তার অস্বাভাবিক আচরণের ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে নিজের অবস্থান তুলে ধরে এসব দাবি করেন এএসআই আ. মান্নান।
এক কাপ চায়ের পরই অস্বাভাবিকতা
ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে মান্নান জানান, গত ৪ সেপ্টেম্বর রাত ৮টার দিকে নারায়ণগঞ্জ সদর বিআইডব্লিউটিএর ৫ নম্বর ঘাটসংলগ্ন প্রত্যয় জাহাজের সামনে নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম করতে যান তিনি।
এর আগে ওই দিন সন্ধ্যায় পূর্বপরিচিত রেদওয়ানুল ইসলাম তার ছোট ভাইকে বিদেশে পাঠানোর জন্য নেওয়া দুই লাখ টাকা ফেরত দেন। ওই টাকা তখন তার কাছে ছিল বলে জানান মান্নান।
তার ভাষ্য, ব্যায়াম করার সময় পূর্বপরিচিত ট্রলার মাঝি মো. বোরহান তাকে নৌকায় করে ৫ নম্বর ঘাটে যাওয়ার প্রস্তাব দেন। পরে তার কথায় তিনি নৌকায় ওঠেন।
মান্নান দাবি করেন, ঘাটে যাওয়ার পথে এক পকেটে থাকা দুই লাখ টাকা দুই পকেটে রাখার সময় বোরহান বিষয়টি দেখে ফেলেন।
৫ নম্বর ঘাটে পৌঁছানোর পর বোরহান একপর্যায়ে ইমরান নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলেন। কিছুক্ষণ পর বোরহান এক কাপ চা এনে তাকে পান করতে দেন। চা পান করার পরই তার শারীরিক ও মানসিক অবস্থায় অস্বাভাবিকতা দেখা দেয় বলে দাবি করেন মান্নান।
‘অচেতন অবস্থায় মারধর করে টাকা নিয়ে যায়’
এএসআই মান্নানের দাবি, চা পান করার পর কী ঘটছিল তা তিনি স্বাভাবিকভাবে বুঝতে পারছিলেন না। এ অবস্থায় বোরহান, ইমরান, মিলন মিয়াসহ কয়েকজন তাকে একটি ছোট কক্ষে নিয়ে আটকে রাখেন।
সেখানে বাঁশের লাঠি ও কাঠের চেলা দিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। বিশেষ করে তার বাম হাঁটু ও বাম হাতে বেশি আঘাত করা হয়েছে বলে জানান।
একপর্যায়ে ইমরান তার প্যান্টের দুই পকেটে থাকা দুই লাখ টাকা নিয়ে যান বলেও অভিযোগ করেন মান্নান।
পরে তাকে ৫ নম্বর ঘাটের একটি চায়ের দোকানের সামনে নিয়ে যাওয়া হয় বলে জানান তিনি। তার দাবি, খবর পেয়ে নৌ পুলিশের সদস্যরা তাকে উদ্ধারে গেলে পুলিশের উপস্থিতিতেও তাকে মারধর করা হয় এবং সেখানে মব সৃষ্টি করা হয়।
‘ভিডিওতে স্ত্রীকে নিয়ে যা বলেছি, তা সত্য নয়’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে মান্নানকে তার স্ত্রীকে নিয়ে বিভিন্ন কথা বলতে শোনা যায়। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ভিডিওতে স্ত্রীকে নিয়ে তাকে যা বলতে শোনা গেছে, সেগুলো সত্য নয়।
মান্নানের ভাষ্য, ওই সময় তিনি অস্বাভাবিক অবস্থায় থাকায় এ ধরনের কথা বলেছেন। তার দাবি, স্ত্রীর সঙ্গে তার কোনো মনোমালিন্য, ঝগড়া বা বিবাদ নেই।
মান্নানের স্ত্রীও একই দাবি করেছেন। তিনি জানান, স্বামীর সঙ্গে তার কোনো ঝগড়া-বিবাদ নেই। ঘটনার খবর পেয়ে তারা সিলেট থেকে নারায়ণগঞ্জে আসেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের নিয়ে যেসব কথা ছড়িয়েছে, সেগুলোও সত্য নয় বলে দাবি করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, তার স্বামীকে কখনো মাদক বা মদপান করতে দেখেননি। তার দাবি, তার স্বামী অনিচ্ছাকৃতভাবে এ ঘটনার শিকার হয়েছেন এবং তিনি ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চান।
ফোন নম্বর ছড়িয়ে পড়ায় বিড়ম্বনায় পরিবার
মান্নানের স্ত্রীর অভিযোগ, ভাইরাল ভিডিওতে তার ফোন নম্বর প্রকাশ পাওয়ায় ঘটনার পর থেকে তারা নানা ধরনের বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছেন।
বিভিন্ন ব্যক্তি ফোন করে টাকা দাবি করছেন এবং নানা ধরনের কথা বলে তাকে অস্বস্তিতে ফেলছেন বলে জানান তিনি।
এমনকি ঘটনার দিন তার স্বামীকে মারধর করা ব্যক্তিরাও তার কাছে টাকা দাবি করেছিলেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন
মান্নান জানান, ঘটনার পর ৫ সেপ্টেম্বর তিনি নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকার রাজারবাগ কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
বর্তমানে তিনি সেখানে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মো. বাহার হোসেনের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন বলে জানান। চিকিৎসক তাকে ২৮ দিন পূর্ণ বিশ্রামে থেকে পরিবারের সঙ্গে থাকার পরামর্শ দিয়েছেন বলেও দাবি করেন তিনি।
‘পরিকল্পিতভাবে ভিডিও ছড়ানো হয়েছে’
ভাইরাল ভিডিও নিয়ে এএসআই মান্নানের অভিযোগ, ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা পরিকল্পিতভাবে তার অস্বাভাবিক অবস্থার ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়েছেন।
এতে তার চাকরিজীবনের সম্মান ক্ষুণ্ন হয়েছে এবং তিনি ও তার পরিবার মানসিকভাবে অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছেন বলে দাবি করেন তিনি।
নিজের অবস্থান তুলে ধরে মান্নান বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওর পেছনের পুরো ঘটনা না জেনেই তাকে নিয়ে নানা মন্তব্য করা হয়েছে। তার দাবি, ঘটনার সময় তিনি স্বাভাবিক অবস্থায় ছিলেন না এবং তাকে পরিকল্পিতভাবে ওই পরিস্থিতির মধ্যে ফেলা হয়েছিল।
তবে এএসআই মান্নানের এসব অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত বোরহান, ইমরান, মিলন মিয়াসহ সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী প্রতিবেদনে তুলে ধরা হবে।

