বুলবুল হত্যা মামলায় প্রধান আসামি শেখ সিফাতসহ ১১ জন গ্রেপ্তার, কঠোর শাস্তির দাবি ইসলামী আন্দোলন ও স্বজনদের
নারায়ণগঞ্জের বন্দর এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে কিশোর গ্যাং ও অপরাধী চক্রের দৌরাত্ম্য নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘সিফাত বাহিনী’ নামে পরিচিত একটি গ্রুপের নেতৃত্বে ছিলেন শেখ সিফাত। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও এলাকায় তাদের তৎপরতা অব্যাহত ছিল বলে অভিযোগ করেন এলাকাবাসী।
বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের ২১, ২২ ও ২৩ নম্বর ওয়ার্ড, পুরান বন্দরসহ আশপাশের এলাকায় সিফাত ও তাঁর সহযোগীদের বিরুদ্ধে ভয়ভীতি, মারধর এবং বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, সন্ধ্যার পর অনেকেই নিরাপত্তার কারণে ঘর থেকে বের হতে ভয় পেতেন। বিভিন্ন নতুন ও পরিত্যক্ত ভবন অপরাধীদের আড্ডা ও আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহৃত হতো বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এই অভিযোগের মধ্যেই গত ২০ আগস্ট রাতে বন্দরের সালেহনগর এলাকায় ইসলামী যুব আন্দোলনের নেতা জাহিদ আল আমিন বুলবুল হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, শেখ সিফাত ও তাঁর সহযোগীরা প্রকাশ্যে হামলা চালিয়ে বুলবুলকে কুপিয়ে হত্যা করেন।
ঘটনার পর থেকেই বন্দরসহ নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। হত্যার দ্রুত বিচার, জড়িতদের গ্রেপ্তার এবং সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা বিক্ষোভ, মিছিল ও সড়ক অবরোধ কর্মসূচি পালন করে আসছেন।
রাতেই অভিযান, গ্রেপ্তার ১১
বুলবুল হত্যাকাণ্ডের পর বন্দর থানা পুলিশ অভিযান চালিয়ে শেখ সিফাতসহ ১১ জনকে গ্রেপ্তার করে। পরে তাদের আদালতে হাজির করা হয়।
২৩ আগস্ট প্রধান আসামি শেখ সিফাতসহ সাত আসামিকে আদালতে হাজির করার সময় ক্ষুব্ধ জনতা ও নিহতের স্বজনেরা তাদের ওপর চড়াও হন। এ সময় আদালত চত্বরে শেখ সিফাতকে মারধরের ঘটনাও ঘটে।
মামলায় শেখ সিফাতসহ সাত আসামির ১০ দিন এবং চার নারী আসামির তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত।
‘প্রশাসনের ব্যর্থতায় বুলবুলকে হারিয়েছি’
২৫ আগস্ট বিকেলে নিহত জাহিদ আল আমিন বুলবুলের বাড়িতে যান ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নায়েবে আমীর মুফতি ফয়জুর করিম। তিনি নিহতের পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা দেন এবং পরিবারের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়ে নগদ দুই লাখ টাকা সহায়তা দেন।
এ সময় বুলবুল হত্যার সঙ্গে জড়িতদের দেশের প্রচলিত আইনে সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানান তিনি।
মুফতি ফয়জুর করিম বলেন, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি, বরং অবনতি হয়েছে। তাঁর দাবি, শেখ সিফাত একজন চিহ্নিত অপরাধী এবং তাঁর বিরুদ্ধে আগে থেকেই প্রশাসনের কাছে অভিযোগ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
তিনি বলেন, প্রশাসনের ব্যর্থতার কারণেই বুলবুলকে প্রাণ হারাতে হয়েছে। ভবিষ্যতে আর কোনো পরিবার যেন এমনভাবে স্বজন হারিয়ে অসহায় না হয়, সে বিষয়ে প্রশাসনকে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
বুলবুল হত্যা মামলার বিচার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে করার দাবিও জানান ইসলামী আন্দোলনের এই নেতা। একই সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের বিচার নিয়ে সরকার অবহেলা করলে জনগণ তা মেনে নেবে না বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
‘সিফাত বাহিনীর’ দৌরাত্ম্য বন্ধের দাবি
স্থানীয় এলাকাবাসী ও নিহতের স্বজনেরা বলছেন, বুলবুল হত্যার ঘটনা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় কিশোর গ্যাং ও অপরাধী চক্রের দৌরাত্ম্য নিয়ে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছিল। তাদের অভিযোগ, বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় অপরাধীরা সক্রিয় থাকার সুযোগ পেয়েছে।
তাদের দাবি, বুলবুল হত্যার সুষ্ঠু তদন্তের পাশাপাশি বন্দরের কিশোর গ্যাং ও অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালাতে হবে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাব বিবেচনা না করে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তারা।
পুলিশের কঠোর অবস্থানের আশ্বাস
বন্দর থানা পুলিশ বলছে, এলাকায় অপরাধ ও কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য বন্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কঠোর অবস্থানে রয়েছে। তরুণ প্রজন্মকে অপরাধী চক্রের সঙ্গে জড়িয়ে পড়া থেকে রক্ষা করতে পরিবারগুলোকেও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে পুলিশ।
বন্দর থানার ওসি জামাল উদ্দিন অভিভাবকদের সন্তানদের চলাফেরা ও বন্ধুমহলের বিষয়ে নজর রাখার পাশাপাশি অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের তথ্য পুলিশকে জানানোর আহ্বান জানিয়েছেন।
কঠোর শাস্তির আশ্বাস
বুলবুল হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আশ্বাস দিয়েছেন নারায়ণগঞ্জ ৫ আসনের সংসদ সদস্য আবুল কালাম। তাঁর রাজনৈতিক সচিব আবুল কাউসার আশার পক্ষ থেকেও বন্দর থানার ওসিকে হত্যাকাণ্ডে জড়িত অন্য আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তারের বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
এখন নিহত বুলবুলের পরিবার, ইসলামী আন্দোলনের নেতাকর্মী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের একটাই দাবি, শুধু গ্রেপ্তার নয়, দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উদঘাটন করে আদালতে অভিযোগপত্র দিতে হবে। একই সঙ্গে বন্দরে দীর্ঘদিনের অপরাধী চক্র ও কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্যের স্থায়ী অবসান ঘটাতে হবে।
বুলবুল হত্যার বিচার ঘিরে এখন নজর বন্দর পুলিশের তদন্তের দিকে। এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে কারা ছিল, কী কারণে হামলা চালানো হয়েছিল এবং আরও কেউ জড়িত কি না, তদন্তেই তার উত্তর মিলবে।

