ডেস্ক রিপোর্ট: জামিন পাওয়ার পর আসামির কারামুক্তির ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের ভোগান্তি ও সময়ক্ষেপণের চিত্র বদলাতে শুরু করেছে অনলাইনে জামিননামা দাখিলের সুবিধা বা ‘ই বেইলবন্ড’ চালুর পর। নারায়ণগঞ্জ থেকে অন্য জেলার কারাগারে থাকা আসামির জামিননামাও এখন দ্রুত অনলাইনে পৌঁছে যাচ্ছে। এতে কমছে অপেক্ষার সময় এবং ভোগান্তি।
এর একটি বাস্তব উদাহরণ মো. সাইদুল ইসলামের কারামুক্তি। ফতুল্লা থানার একটি মাদক মামলায় গ্রেপ্তারের পর তিনি নীলফামারী জেলা কারাগারে বন্দি ছিলেন। গত ১০ আগস্ট নারায়ণগঞ্জের ম্যাজিস্ট্রেট আদালত থেকে জামিন পান তিনি। একই দিন দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে তার জামিননামা অনলাইনে দাখিল করা হয়। এরপর প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে মাত্র একদিনের ব্যবধানে ১২ আগস্ট সকালে নীলফামারী কারাগার থেকে মুক্তি পান সাইদুল।
সাইদুলের জামিন কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত আইনজীবী অ্যাডভোকেট আদনান মোল্লা বলেন, পুরোনো পদ্ধতিতে আদালতের জামিননামার কাগজ এক জেলা থেকে অন্য জেলার কারাগারে পৌঁছাতে বেশ কয়েক দিন সময় লাগত। ফলে আদালত থেকে জামিন পাওয়ার পরও কারামুক্তির জন্য আসামিকে অপেক্ষা করতে হতো।
তিনি বলেন, সাইদুলের জামিননামা অনলাইনে দাখিলের প্রায় তিন ঘণ্টার মধ্যেই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নারায়ণগঞ্জ জেলা কারাগারের সার্ভারে পৌঁছে যায়। পরে সেখান থেকে তথ্য নীলফামারী জেলা কারাগারে পাঠানো হয়। এর পরদিনই কারাগার থেকে মুক্তি পান তিনি।
অ্যাডভোকেট আদনান মোল্লার ভাষায়, পুরোনো ব্যবস্থায় একই প্রক্রিয়ায় পাঁচ থেকে সাত দিন পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারত। ই বেইলবন্ডের কারণে সেই দীর্ঘসূত্রতা অনেকটাই কমেছে।
নারায়ণগঞ্জে গত বছরের ১৬ অক্টোবর অনলাইনে জামিননামা দাখিলের কার্যক্রম শুরু হয়। পরবর্তীতে আরও কয়েকটি জেলায় এ ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করা হয়। নতুন এ ব্যবস্থায় আদালত থেকে কারাগারে জামিনসংক্রান্ত নথি পাঠানোর প্রক্রিয়া ডিজিটাল হওয়ায় বিচারপ্রার্থী, আইনজীবী ও কারা কর্তৃপক্ষের সময় ও শ্রম দুটোই কমছে।
জামিনের পর কারামুক্তির তথ্য মোবাইল ফোনে এসএমএসের মাধ্যমেও পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। ফলে আগের মতো সংশ্লিষ্ট দপ্তরে বারবার যোগাযোগ করার প্রয়োজনও কমেছে।
নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালতের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোসাম্মৎ মাহমুদা খাতুন বলেন, আগে আদালতের কর্মীদের হাতে করে জামিনের কাগজ কারাগারে নিয়ে যেতে হতো। এখন অনলাইনে কাজ হওয়ায় সময় ও শ্রম কম লাগছে। একই সঙ্গে বিচারপ্রার্থীদের হয়রানিও কমেছে।
তবে নতুন ব্যবস্থায় কিছু প্রযুক্তিগত সমস্যার কথাও জানিয়েছেন আইনজীবীরা। সার্ভারে প্রবেশে জটিলতা, সময়মতো ওটিপি না পাওয়া এবং তথ্যের সামান্য ভুলের কারণে কখনো কখনো পুরো প্রক্রিয়া আবার করতে হচ্ছে।
নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট সরকার হুমায়ূন কবির বলেন, সব আইনজীবী অনলাইনভিত্তিক কার্যক্রমে সমানভাবে অভ্যস্ত নন। বিশেষ করে প্রবীণ আইনজীবীদের কেউ কেউ এ প্রক্রিয়ায় সমস্যায় পড়ছেন। ভুল তথ্য গেলে সংশোধনের জন্য আবার নতুন করে প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়।
তার সঙ্গে শিক্ষানবীশ হিসেবে কাজ করা আইনজীবী রুবেল মিয়া জানান, তথ্যগত ভুলের কারণে এক আসামির কারামুক্তিতে অতিরিক্ত দুই দিন সময় লেগেছিল। এ ধরনের জটিলতা কমাতে তথ্য যাচাইয়ের প্রক্রিয়া আরও সহজ করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
ই বেইলবন্ড কার্যক্রম শুরুর আগে প্রশিক্ষণ নেওয়া অ্যাডভোকেট আদনান মোল্লাও প্রযুক্তিগত কিছু সমস্যার কথা তুলে ধরেছেন। তার মতে, ওয়েবসাইটে প্রবেশের লিংক অনেক সময় ঠিকভাবে কাজ করে না এবং কখনো কখনো ওটিপির মেসেজও সময়মতো আসে না। ফলে কয়েকবার চেষ্টা করতে হয়।
তবে এসব সীমাবদ্ধতা দূর করা গেলে অনলাইন জামিননামা দাখিলের ব্যবস্থা বিচারপ্রার্থীদের জন্য আরও কার্যকর হবে বলে মনে করেন তিনি।
আইনজীবী অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ই বেইলবন্ড চালুর ফলে আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীদের হয়রানি অনেকটাই কমেছে। তবে প্রযুক্তিগত ত্রুটি দূর করে পুরো প্রক্রিয়াটি আরও সহজ করা প্রয়োজন।
নারায়ণগঞ্জ জেলা কারাগারের সুপার আব্দুল কুদ্দুছ বলেন, অনলাইনে জামিননামা পাঠানোর ব্যবস্থা বিচার বিভাগের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। এতে জামিন পাওয়ার পর কারাগার থেকে মুক্তি পর্যন্ত যে দীর্ঘ প্রক্রিয়া ছিল, তা অনেকটাই দ্রুত হয়েছে। পাশাপাশি এ প্রক্রিয়ার মাঝখানে অনিয়মের সুযোগও কমেছে।
আইনজীবীদের মতে, প্রযুক্তিগত সমস্যাগুলো সমাধান করে ই বেইলবন্ড ব্যবস্থাকে আরও ব্যবহারবান্ধব করা গেলে নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন জেলার কারাগারে জামিনপ্রাপ্ত বন্দিদের দ্রুত মুক্তির পথ আরও সহজ হবে।

