মাদক ব্যবসা শুধু একটি অপরাধ নয়, এটি একটি সুসংগঠিত নেটওয়ার্ক। সমাজের শিকড় পর্যন্ত বিস্তৃত এই নেটওয়ার্ক কেবল ব্যক্তি নয়, পরিবার, শিক্ষা ব্যবস্থা, সামাজিক মূল্যবোধ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ধ্বংস করছে। তাই মাদককে শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে দেখলে হবে না, এটিকে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংকট হিসেবেও বিবেচনা করতে হবে।
এলাকাভিত্তিক মাদক নির্মূলের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর মধ্যে রয়েছে শক্তিশালী সিন্ডিকেট, রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়, তথ্যদাতা ও সাক্ষীর অভাব, নিরাপত্তাহীনতা, আইনের ফাঁকফোকর এবং কিছু অসাধু ব্যক্তির সহযোগিতা। ফলে অনেক সময় মাদক ব্যবসায়ীরা আইনের আওতায় এলেও স্থায়ীভাবে এই অপরাধ বন্ধ করা সম্ভব হয় না।
আমরা প্রায়ই শিশু ধর্ষণ, হত্যা, ছিনতাই, কিশোর গ্যাং কিংবা পারিবারিক সহিংসতার ঘটনা নিয়ে আলোচনা করি। কিন্তু এসব ঘটনার পেছনে মাদকের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাব কতটা গভীর, সে বিষয়টি অনেক সময় আড়ালে থেকে যায়। মাদক একজন মানুষের বিবেককে দুর্বল করে, তাকে অপরাধপ্রবণ করে তোলে এবং ধীরে ধীরে সমাজের জন্য হুমকিতে পরিণত করে।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, আমাদের কিশোর ও তরুণদের একটি অংশ এমন এক সংস্কৃতির মধ্যে প্রবেশ করছে যেখানে অনলাইন জুয়া, ক্ষতিকর গেমিং আসক্তি এবং মাদককে অনেক সময় স্বাভাবিক বা আকর্ষণীয় বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু কনটেন্ট হয়তো তাদের সাময়িক জনপ্রিয়তা বা কিছু অর্থ এনে দিচ্ছে, কিন্তু এর দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ক্ষতির হিসাব কেউ রাখছে না। কত পরিবার ভেঙে যাচ্ছে, কত স্বপ্ন নষ্ট হচ্ছে, কত মা-বাবা সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় রাত কাটাচ্ছেন, তার প্রকৃত পরিসংখ্যান হয়তো কোনোদিন জানা যাবে না।
বর্তমানে মাদকবিরোধী বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়ে সমালোচনাও দেখা যায়। কেউ কেউ এগুলোকে লোকদেখানো উদ্যোগ বলে উড়িয়ে দেন। সমালোচনার জায়গা অবশ্যই থাকতে পারে, তবে এটাও সত্য যে কোনো উদ্যোগই না থাকার চেয়ে সীমিত উদ্যোগও ভালো। কারণ পরিবর্তনের সূচনা সব সময় ছোট পদক্ষেপ থেকেই হয়।
তবে আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু অভিযান পরিচালনা নয়, বরং টেকসই সমাধান তৈরি করা। প্রশ্ন হলো, আমরা কি মাদকাসক্ত বা ঝুঁকিতে থাকা তরুণদের জন্য এমন সামাজিক পরিবেশ গড়ে তুলতে পারি, যেখানে তারা নতুন করে নিজেকে প্রতিষ্ঠার সুযোগ পাবে?
খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজ, কারিগরি প্রশিক্ষণ, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তৈরির উদ্যোগ এবং সামাজিক উন্নয়নমূলক প্রকল্পে তাদের সম্পৃক্ত করা যেতে পারে। মাদক ও মোবাইল আসক্তির বিকল্প হিসেবে যদি তাদের সামনে সম্মানজনক কর্মসংস্থান, সৃজনশীলতা প্রকাশের সুযোগ এবং সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করা যায়, তাহলে অনেকেই অপরাধ ও আসক্তির পথ থেকে ফিরে আসতে পারে।
মাদকবিরোধী লড়াই শুধু প্রশাসনের দায়িত্ব নয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠন, জনপ্রতিনিধি এবং সচেতন নাগরিকদের সম্মিলিত অংশগ্রহণ ছাড়া এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। একজন মাদকাসক্তকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে নয়, বরং পুনর্বাসন ও ইতিবাচক সম্পৃক্ততার মাধ্যমে সমাজের মূলধারায় ফিরিয়ে আনাই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর পথ।
আমাদের মনে রাখতে হবে, মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুধু মাদক ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে নয়, এটি আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষার যুদ্ধ। আর সেই যুদ্ধে সফল হতে হলে অভিযানের পাশাপাশি প্রয়োজন মানবিক, বাস্তবসম্মত এবং দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক উদ্যোগ।
লেখক: মতামত ব্যক্তিগত

