সব মামলায় জামিনে মুক্ত হয়ে নারায়ণগঞ্জে ফিরেছেন সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী। দীর্ঘ এক বছরের বেশি সময় কারাবন্দি থাকার পর তার মুক্তি এবং আগামী নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণায় নগর রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনার ঝড় উঠেছে। বিশেষ করে দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচনের প্রস্তুতি নেওয়া বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরে নতুন হিসাব-নিকাশ শুরু হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বুধবার (৩ জুন) দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে নারায়ণগঞ্জ শহরের চুনকা কুটিরে নিজ বাসভবনে ফেরেন আইভী। কারামুক্তির পর তিনি সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
কারা কর্তৃপক্ষ জানায়, আদালতের জামিনের আদেশ ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই-বাছাই শেষে রাত ১০টা ৮ মিনিটে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়। তার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া ১২টি মামলায় হাইকোর্ট থেকে পাওয়া জামিন আপিল বিভাগেও বহাল থাকায় মুক্তিতে আর কোনো আইনি বাধা ছিল না।
কারা অধিদপ্তরের সহকারী কারা মহাপরিদর্শক (এআইজি) জান্নাত উল ফরহাদ জানান, আদালতের নির্দেশনা ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পাওয়ার পর সকল প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। অন্য কোনো আটকাদেশ না থাকায় তার কারামুক্তিতে বাধা ছিল না।
আইভীর আইনজীবী অ্যাডভোকেট আওলাদ হোসেন বলেন, তার মক্কেল এক বছরেরও বেশি সময় কারাবন্দি ছিলেন। আদালত সব মামলায় জামিন দিয়েছেন। তিনি আইনি লড়াই চালিয়ে যাবেন এবং আগামী নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অংশ নেবেন।
আইভীর নির্বাচনে অংশগ্রহণের এই ঘোষণাই এখন নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গনের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়। কারণ, গত এক বছর ধরে সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে সামনে রেখে বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরের প্রায় ডজনখানেক সম্ভাব্য প্রার্থী মাঠ গোছানোর কাজ করছিলেন। কেউ দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার আশায়, কেউবা বৃহত্তর বিরোধী ঐক্যের প্রার্থী হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে নগরজুড়ে জনসংযোগ, সামাজিক কার্যক্রম ও রাজনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়েছিলেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, টানা তিনবারের নির্বাচিত মেয়র হিসেবে আইভীর রয়েছে একটি শক্তিশালী ব্যক্তিগত ভোটব্যাংক, দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং নগরবাসীর একটি অংশের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা। ফলে তিনি নির্বাচনী মাঠে সক্রিয় হলে সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বীদের জন্য লড়াই আগের চেয়ে অনেক বেশি কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
নগর রাজনীতির পর্যবেক্ষকদের ভাষ্য, এতদিন সম্ভাব্য নির্বাচনী সমীকরণে আইভীর অনুপস্থিতিকে ধরে নিয়ে অনেকেই প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। কিন্তু তার কারামুক্তি এবং সরাসরি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা পুরো রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ফলে বিরোধী শিবিরের অনেক সম্ভাব্য প্রার্থীকে এখন নতুন করে নিজেদের অবস্থান, কৌশল এবং নির্বাচনী পরিকল্পনা সাজাতে হতে পারে।
উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের ৯ মে নারায়ণগঞ্জের দেওভোগ এলাকার বাসা থেকে গ্রেপ্তারের পর সেলিনা হায়াৎ আইভীকে কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়। চব্বিশের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকে কেন্দ্র করে দায়ের হওয়া হত্যা ও হত্যাচেষ্টাসহ একাধিক মামলায় তিনি জামিন পান। পরবর্তীতে আপিল বিভাগও সেই জামিন বহাল রাখে।
২০০৩ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার মেয়র ছিলেন সেলিনা হায়াৎ আইভী। পরে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন গঠনের পর অনুষ্ঠিত টানা তিনটি নির্বাচনে তিনি মেয়র নির্বাচিত হন। বর্তমানে তিনি নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন।
সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে ঘিরে নারায়ণগঞ্জে এবার সবচেয়ে আলোচিত ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাজনৈতিক লড়াই দেখা যেতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। আর সেই লড়াইয়ের কেন্দ্রে আবারও উঠে এসেছেন সেলিনা হায়াৎ আইভী।

