২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সকাল। ছাত্র-জনতার মিছিলে এলোপাথারি গুলি ছোড়েন আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের নেতৃত্বে তার ছেলে-ভাতিজাসহ সহযোগীরা। শামীম ওসমানের ছেলে ইমতিনান ওসমান অয়ন ওরফে অয়ন ওসমানের পিস্তল থেকে ছোড়া একটি গুলি লাগে আন্দোলনকারী আবুল হাসান স্বজনের বুকে। পরদিন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যান এ তরুণ।
বুধবার (১০ জুন) ঢাকায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ দেওয়া জবানবন্দিতে এসব তথ্য জানান নিহতের বড়ভাই মো. আবুল বাশার অনিক।
তার ভাষ্য, তার ভাইয়ের বুকের বা পাশে বিদ্ধ গুলিটি ছোড়া হয়েছিল অয়ন ওসমানের হাতে থাকা পিস্তল থেকে।
এদিন অন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত দশটি হত্যাকাণ্ডের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারকাজ শুরু হয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেলের সামনে সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন করে প্রসিকিউশন।
এরপর আদালতে সাক্ষ্যগ্রহণ পর্ব শুরু হয়। এদিন, আদালতে চব্বিশের ৫ আগস্ট নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাঢ়ায় গুলিতে নিহত ছোটভাই আবুল হাসান স্বজনের বড়ভাই মো. আবুল বাশার অনিক জবানবন্দি দেন।
জবানবন্দিতে আবুল বাশার বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সকালে নারায়ণগঞ্জের বন্দর থানার কুশিয়ারা গ্রামের বাসা থেকে তিনি ও আবুল হাসান বের হন। আন্দোলনে যোগ দেওয়ার জন্য তাঁরা নারায়ণগঞ্জের চাষাড়া মোড়ের উদ্দেশে রওনা দেন। চাষাড়া মোড়ে আন্দোলনে যোগ দিলে বিজিবি, পুলিশ, ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা তাঁদের ধাওয়া করে। পরবর্তী সময়ে তাঁরা চাষাড়া মোড়ে অবস্থান নেন। চাষাড়া মোড় থেকে মিশনপাড়ার দিকে মিছিল নিয়ে যান তাঁরা।
“আবার মিছিল নিয়ে চাষাড়া মোড়ের দিকে আসতে থাকেন, তখন ল্যাবএইড হাসপাতাল গলিতে শামীম ওসমানের নেতৃত্বে তাঁর ছেলে অয়ন ওসমান, ভাতিজা আজমীরী ওসমান, শ্যালক তানভীর রহমান টিটু, শাহ নিজাম, আবদুল করিম বাবু (ডিস বাবু), কামরুল হাসান মুন্না, ছাত্রলীগ নেতা শুভ, রিয়াদ, সোহানুর রহমান শুভ্র, মেহেদী, ফরহাদসহ ১০০–২০০ জন অস্ত্রধারী তাঁদের ওপর এলোপাতাড়ি গুলি করা শুরু করেন। অয়ন ওসমানের পিস্তল থেকে ছোড়া গুলি তাঁর ভাই আবুল হাসানের বুকের বাঁ পাশে বিদ্ধ হয়,” জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন নিহতের ভাই।
আবুল বাশার বলেন, গুলিবিদ্ধ আবুল হাসানকে নারায়ণগঞ্জ ভিক্টোরিয়া হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসা না দেওয়ার জন্য শামীম ওসমানের নির্দেশ ছিল। তাই ভিক্টোরিয়া হাসপাতালে তাঁর ভাইকে ভর্তি করানো হয়নি, চিকিৎসাও দেয়নি। তাঁরা সঙ্গে সঙ্গে একটি অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উদ্দেশে রওনা দেন। ঢাকা মেডিকেলে পৌঁছালে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে তাঁর ভাইকে দ্রুত অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেন চিকিৎসকেরা। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সন্ধ্যা ৬টায় তাঁর ভাইকে অস্ত্রোপচারকক্ষে নেওয়া হয়। অস্ত্রোপচার শেষে তাঁকে পর্যবেক্ষণকক্ষে (অবজারভেশন রুম) নেওয়া হয়। ঘণ্টাখানেক পর তাঁর ভাইয়ের জ্ঞান ফেরে। তিনি পর্যবেক্ষণকক্ষে দেখা করতে যান। তাঁর ভাই তাঁকে দেখে প্রথমে জানতে চান, হাসিনার পতন হয়েছে কি না। হাসিনা ভারতে পালিয়ে গেছেন এ কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর ভাই মুচকি হাসি দেন। ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলে তিনি চুপ হয়ে যান। ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট বিকেল ৫টার সময় তাঁর ভাই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন।

