মহান মে দিবসের রক্তঝরা ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় দাঁড়িয়ে আজ আমাদের বলতে হচ্ছে—বাংলাদেশের শ্রমিকশ্রেণী এখনো শোষণ ও বঞ্চনার শৃঙ্খলে বন্দি। আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবসের মূল চেতনা ছিল শ্রমিকের নিরাপত্তা, সুস্বাস্থ্য ও শ্রমের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। ২৪ এপ্রিলের রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির ১৪ বছর পেরিয়ে গেলেও শ্রমিকের জীবনের নিরাপত্তা আজও নিশ্চিত হয়নি।
সেই ভয়াবহ ঘটনায় নিহত ১১৭৫ জনকে কেবল সংখ্যা হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল। অথচ তারা প্রত্যেকেই ছিল একেকটি স্বপ্ন, একেকটি জীবন। মুনাফার লোভে মালিকপক্ষের অবহেলা এবং প্রশাসনের উদাসীনতায় সংঘটিত সেই হত্যাকাণ্ডের বিচার আজও সম্পন্ন হয়নি। এক যুগ পরও প্রশ্ন থেকেই যায়—শ্রমিকের জীবন কি এখন নিরাপদ? যদি নিরাপদ হতো, তাহলে কেন এখনো বিভিন্ন কারখানায় অগ্নিকাণ্ড, বয়লার বিস্ফোরণসহ নানান দুর্ঘটনায় শ্রমিকদের প্রাণ ঝরছে?
শ্রমের মর্যাদার প্রশ্নেও একই চিত্র। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে সাধারণ শ্রমিক আজ দিশেহারা। যেখানে চালের দাম ৭০-৮০ টাকা ছাড়িয়েছে, সেখানে ১২,৫০০ টাকার ন্যূনতম মজুরি নিছকই উপহাস। এর বিপরীতে যখন শ্রমিকরা ন্যায্য মজুরির দাবিতে আন্দোলনে নামে, তখন তাদের ওপর নেমে আসে দমন-পীড়ন। লাঠিচার্জ, গুলি ও মামলার ভয় দেখিয়ে তাদের কণ্ঠ রুদ্ধ করা হয়। তাহলে শ্রমিকের মর্যাদা কোথায়?
স্বাস্থ্যখাতেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে হামের প্রাদুর্ভাব শ্রমিকদের জীবনকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। ভঙ্গুর স্বাস্থ্যব্যবস্থা, ব্যয়বহুল চিকিৎসা এবং সরকারি হাসপাতালে পর্যাপ্ত সেবা ও টিকার অভাবে শ্রমিক ও তাদের পরিবার চরম সংকটে রয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে—শ্রমিকের স্বাস্থ্য সুরক্ষার দায়িত্ব কার?
এই প্রেক্ষাপটে সময়ের দাবি হলো শ্রমিকবান্ধব রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা। বর্তমান বাজারদর ও মুদ্রাস্ফীতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি ২৫,০০০ থেকে ৩০,০০০ টাকায় উন্নীত করতে হবে। পাশাপাশি শ্রমিকের নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা এবং শ্রমের মর্যাদা নিশ্চিত করতে সরকার ও প্রশাসনকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত না করে কোনো উন্নয়নই টেকসই হতে পারে না। এই বাস্তবতা অনুধাবন করেই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে।

