দীর্ঘ প্রায় ৯ বছর দায়িত্ব পালনের পর জামিয়া আরাবিয়া দারুল উলূম দেওভোগ মাদরাসার প্রিন্সিপাল মাওলানা আবু তাহের জিহাদীর বিদায় ঘিরে নারায়ণগঞ্জজুড়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। হাজারো আলেমের শিক্ষক হিসেবে পরিচিত এই শিক্ষাবিদের বিদায়কে ঘিরে আবেগঘন পরিবেশ তৈরি হলেও তার বিদায় অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের অনুপস্থিতি অনেককে বিস্মিত করেছে।
প্রতিষ্ঠান সূত্রে জানা যায়, বিদায় অনুষ্ঠানে মাদরাসার পরিচালনা কমিটির সদস্যরা তাকে ফুল দিয়ে সম্মান জানালেও তার দীর্ঘদিনের শিক্ষার্থীদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি ছিল না। বিদায়ী বক্তব্যে আবেগাপ্লুত হয়ে মাওলানা আবু তাহের জিহাদী শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে বলেন, তাকে ঘিরে যে অভিযোগ ছড়ানো হয়েছে তা সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং তিনি কখনো কোনো শিক্ষককে বহিষ্কারের পরিকল্পনা করেননি।
তিনি বলেন, “আল্লাহকে সাক্ষী রেখে বলছি, আমি কোনো শিক্ষককে বহিষ্কারের পরিকল্পনা করিনি, এমনকি স্বপ্নেও ভাবিনি। যদি করে থাকি, তাহলে আল্লাহ আমাকে ধ্বংস করে দিন। এটি একটি মিথ্যা অপপ্রচার।”
সংশ্লিষ্টদের দাবি, মাওলানা আবু তাহের জিহাদী টানা ৯ বছর প্রিন্সিপাল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, যা প্রতিষ্ঠানটির ইতিহাসে অন্যতম দীর্ঘ সময়। দায়িত্ব পালনের সময় তিনি মাদরাসার উন্নয়ন ও শিক্ষার পরিবেশ বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন বলে এলাকাবাসীর একটি বড় অংশ মনে করেন।
তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি পরিবর্তিত হতে শুরু করে। বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে মতবিরোধ বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের একটি অংশের সঙ্গে দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে রূপ নেয়। এ সময় কয়েকজন শিক্ষককে বহিষ্কারের গুজব ছড়িয়ে আন্দোলনের সূত্রপাত হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। যদিও সংশ্লিষ্টদের দাবি, এমন কোনো বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত বাস্তবে নেওয়া হয়নি।
পরবর্তীতে শিক্ষার্থীদের একটি অংশকে উসকানি দেওয়ার অভিযোগে শিক্ষক মুফতি হারুন অর রশিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। গত ৫ জুলাই পরিচালনা কমিটির সদস্যদের মাদরাসায় প্রবেশে বাধা দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। পরে প্রশাসন, হেফাজতে ইসলাম, বিএনপি ও অন্যান্য নেতাদের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি সাময়িকভাবে শান্ত হয় এবং আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের আশ্বাস দেওয়া হয়।
তবে কয়েকদিনের মধ্যেই শিক্ষার্থীদের আন্দোলন আবারও শুরু হয়। এবার তাদের একমাত্র দাবি ছিল প্রিন্সিপাল মাওলানা আবু তাহের জিহাদীর পদত্যাগ। গত ১১ জুলাই শিক্ষার্থীরা বৃষ্টির মধ্যেই মাদরাসা প্রাঙ্গণে বিক্ষোভ করেন এবং বিভিন্ন স্লোগানের মাধ্যমে তার পদত্যাগ দাবি জানান। শেষ পর্যন্ত উদ্ভূত পরিস্থিতিতে পরিচালনা কমিটি তাকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
বিদায় মুহূর্তে আবেগঘন বক্তব্যে মাওলানা আবু তাহের জিহাদী বলেন, তার বিদায়ের পেছনের প্রকৃত কারণ একদিন প্রকাশ পাবে। একই সঙ্গে তিনি পরিচালনা কমিটি ও এলাকাবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ভবিষ্যতে যেন কোনো প্রিন্সিপালকে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে না হয় এবং ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদঘাটন করা হয়।
এদিকে, বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় ধর্মীয় ও সামাজিক অঙ্গনে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। কেউ এটিকে একটি দুঃখজনক অধ্যায়ের সমাপ্তি হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ পুরো ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তবে অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য আনুষ্ঠানিকভাবে পাওয়া যায়নি।

