নারায়ণগঞ্জের বন্দরের মদনপুরে অবস্থিত ‘মা হাসপাতাল’-এ সিজারিয়ান অপারেশনের সময় প্রসূতির খাদ্যনালী কেটে ফেলার অভিযোগ উঠেছে। অপারেশনের পর টানা চার দিন তীব্র পেটব্যথা ও পেট ফুলে যাওয়ার পরও বিষয়টি গুরুত্ব না দেওয়ার অভিযোগ করেছে ভুক্তভোগী পরিবার। পরে শারীরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি হলে ২৩ বছর বয়সী প্রসূতি সিনথিয়া রহমান সন্ধ্যাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে জরুরি ভিত্তিতে অস্ত্রোপচার করা হয়। বর্তমানে তিনি আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন।
এ ঘটনায় প্রসূতির মা মানসুরা (৪০) বাদী হয়ে বন্দর থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। অভিযোগে ‘মা হাসপাতাল’-এর মালিক রুহুল আমিন (৪৯), সিজার পরিচালনাকারী চিকিৎসক ডা. সাইমা আক্তার (৩৮) এবং অজ্ঞাতনামা আরও ৩ থেকে ৪ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, গত ১০ আগস্ট সকাল ৭টায় ৯ মাসের অন্তঃসত্ত্বা সিনথিয়াকে মদনপুরের মা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সকাল ১০টার দিকে ডা. সাইমা আক্তার তাকে অপারেশন থিয়েটারে নেন। বেলা ১১টা ১০ মিনিটে সিজারের মাধ্যমে একটি সুস্থ পুত্রসন্তানের জন্ম হয়।
পরিবারের অভিযোগ, অপারেশনের পর সিনথিয়াকে পোস্ট অপারেটিভ বা নিবিড় পর্যবেক্ষণে না রেখে সাধারণ বেডে রাখা হয়। এরপর থেকেই তার পেটে তীব্র ব্যথা শুরু হয় এবং ধীরে ধীরে পেট ফুলতে থাকে। বিষয়টি স্বজনরা চিকিৎসক ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে বারবার জানালেও তারা এটিকে গ্যাসের সমস্যা বলে উল্লেখ করেন। সাধারণ ব্যথানাশক ও স্যালাইন দিয়ে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া হয় বলে অভিযোগ পরিবারের।
অভিযোগে আরও বলা হয়, চার দিন পর ১৩ আগস্ট সকালে ‘বাথরুম হলে পেটের ফোলা কমে যাবে’ বলে রোগীকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়। ওই দিন রাত ১১টার দিকে ব্যথা অসহনীয় হয়ে উঠলে রাত ১টার দিকে তাকে পুনরায় মা হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরিবারের দাবি, তখনও কর্তব্যরত চিকিৎসকরা সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে বলেন।
রাত সাড়ে ৩টার দিকে সিনথিয়ার অবস্থার আরও অবনতি হলে তার স্বামী মো. মাসুম (৩১) তাকে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসকরা তার অবস্থা আশঙ্কাজনক দেখে জরুরি ভিত্তিতে মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করে অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেন।
স্বজনদের দাবি, ঢামেকের চিকিৎসকরা তাদের জানিয়েছেন, সিজারিয়ান অপারেশনের সময় অসাবধানতাবশত প্রসূতির খাদ্যনালী কেটে যাওয়ার কারণে পেটের ভেতরে খাবার জমে মারাত্মক ইনফেকশন তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ইতোমধ্যে ঢামেকে সিনথিয়ার আরও দুটি অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। বর্তমানে তিনি জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে রয়েছেন বলে জানিয়েছে পরিবার।
পরিবারের আরও অভিযোগ, কথিত ভুল চিকিৎসার বিষয়ে জানতে চাইলে মা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে এবং ভয়ভীতি দেখিয়ে হাসপাতাল থেকে বের করে দেয়।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মা হাসপাতালের পরিচালক রুহুল আমিন। তিনি দাবি করেন, সিজারিয়ান অপারেশন সফলভাবেই সম্পন্ন হয়েছিল এবং রোগী চার দিন চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ অবস্থায় হেঁটে বাড়ি ফিরেছিলেন। পরে কীভাবে তার শারীরিক সমস্যা হয়েছে, তা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের জানা নেই বলে দাবি করেন তিনি।
রুহুল আমিন বলেন, পুনরায় হাসপাতালে আনার পর দুর্ঘটনাজনিত রক্তক্ষরণের কারণে পেট ফুলে থাকতে পারে। তার দাবি, তারাই রোগীকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠিয়েছেন। সেখানে কোনো ইনফেকশন হয়ে থাকলে তার দায় মা হাসপাতালের নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তবে রোগীকে পুনরায় তাদের হাসপাতালে নিয়ে এলে চিকিৎসার যাবতীয় খরচ বহন করে সুস্থ করার দায়িত্ব নেওয়ার কথাও জানান তিনি।
এ ঘটনায় মদনপুর এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, অভিযোগটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হোক।

